মনতোষ দে লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মনতোষ দে লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

১৮ আগস্ট, ২০১৪

হৃদ মাঝারে রাখবো - মনতোষ দে

ক্লাস থেকে বের হয়ে একটু চিন্তায় পরলাম। পকেটে মাত্র একশ টাকা। সম্বল বলতে এটুকুই। কাল নীলের জন্মদিন। তিন বছর ধরে একসাথে আছি। ছেলেটাকে কখনোই কিছু দেয়া হয়নি। পৃথীবিতে কিছু কিছু মানুষ আছে যারা অল্পতেই খুশী। নীলও তাই। ও এমন একটা ছেলে যার কাছে কিছুই লুকানো যায়না। আর তাই তিন বছরের মধ্যে ওর সামনে কখনো মন খারাপ করতে পারিনি। এমনিতেই ও অনেক বেশি কেয়ারিং।
নীলের সাথে আমার পরিচয় কলেজে । স্কুল থেকে বের হয়ে প্রথমেই নিজেকে গুছিয়ে নিতে কিছু সময় লাগে। জীবনের বড় একটা অংশ ভালোবাসার কাছ থেকে দূরে থাকার ফলে ছেলেদের প্রতি তীব্র কৌতূহল ছিল। যদিও ছেলে হিসেবে আমি বেশ লাজুক প্রকৃতির। একবার কলেজের এর সামনে বসে ফুচকা খাওয়ার পর টাকা দিতে গেলে খেয়াল করলাম পকেটে মানিব্যাগ নেই। এক প্রকার অস্বস্তির মধ্যে পড়লাম। ছোটবেলা থেকেই আত্মসম্মান বোধটা আমার প্রচন্ড। ফুচকাওয়ালাকে বললাম 'কাকা , মানিব্যাগ ফেলে এসেছি। আমার কাছে টাকা নাই। এই ঘড়িটা রাখুন।' দোকানী বিজয়ীর হাসি দিল। স্টিভ জবস আইপড আবিস্কার করে যেমন হাসি দিয়েছিলেন অনেকটা সেরকম। জীবনের সেই চরম অপমানজনক অবস্থা থেকে নীলই আমাকে রক্ষা করেছিল। সেই থেকে একসাথে আছি। জীবনের বাকীটা পথও এভাবেই থাকার ইচ্ছা।
মনে মনে একটা হিসেব দাঁড় করালাম। কাল নীলের একুশতম জন্মদিন। থানা মোর থেকে একুশটা লাল গোলাপ কিনতে হবে। আর সাথে নীলের সবচেয়ে পছন্দের কৃষ্ণপক্ষ বইটা। সবমিলিয়ে দেড়শ টাকার মধ্যে হয়ে যাওয়ার কথা। বিকেলে অবশ্য হাতে কিছু টাকা আসবে। প্রথম আলোর সাহিত্য পাতায় গত সপ্তাহে আমার একটা লেখা ছাপা হয়েছিল। তার সম্মানী হিসেবে কিছু পাওয়ার কথা। আসলে বালুরঘাট শহরে অর্থের কষ্টটা কাউকে বুঝতে দেয়া যায়না। প্রিয় মানুষ গুলোকে তো না ই। আর নীল যদি জানতে পারে আমার এ অবস্থা তা হলে নির্ঘাত খুন করে ফেলবে। হাতে এক হাজার টাকার নোট ধরিয়ে দিয়ে বলবে 'ধুর গাধা। ফ্রেন্ডদের কাছে কিছু লুকোতে হয়?' গত তিনবছরে অনেকবার এমন হয়েছে। যদিও নীল আমার শুধু বন্ধুই না, বন্ধুর চেয়ে কিছুটা ওপরে। তবে আমার ইচ্ছে কাল ওকে আমার ভালোবাসার কথা বলবো।
আগে থেকেই প্লান করা। সকালে ও স্যারের কাছে পড়তে আসবে। সেখান থেকে দু জন বেড়িয়ে যাবো। নীলের সাথে ঘোরার একটা আলাদা মজা আছে। সারাক্ষন পাগলামী করবে। কখনো চুল ধরে,কখনো শার্ট ধরে টান মারবে। আর সবসময় হাসির কথাবার্তা। দামী কোন রেস্তোরায় খেতে গেলে বলবে 'ধুর বোকা,তুই কি অনেক টাকা আয় করিস? তার চেয়ে আয় বাদাম খাই। শোন বাদাম হলো ভালোবাসার ফল। দেখিস না খোসার মধ্যে দু টো ফল। একটা তুই আর একটা আমি। আর আবরন হয়ে আছে ভালোবাসা কিংবা বন্ধুত্ব। বলেই জোড়ে হাসত। বালুরঘাট শহরের আকাশ বাতাস কাঁপানো সে হাসি দেখে মনে হত এই মানুষটার কোন দুঃখ নেই। থাকতে পারেনা।
বিকেলে প্রথম আলোর সাহিত্য পাতার অফিসে গেলাম। যা ভেবেছিলাম তার চেয়ে অল্প কিছু টাকা বেশি পাওয়া গেলো। হলে ফেরার পথে একুশটা সাদা গোলাপই কিনলাম। ইচ্ছে ছিল লাল গোলাপ কিনবো। কিন্তু নীল এখনো আমার বন্ধু। লাল গোলাপ দেয়ার সাহস হলোনা। ফুল কেনার পর গেলাম বই মার্কেটে। অনেক খুঁজে কৃষ্ণপক্ষ বইটা কিনলাম। হাতে কিছু টাকা বেশি থাকায় একটা কবিতার বই ও কিনলাম। নীলের আবার হুমায়ুন খুব পছন্দ। মাঝেমাঝে ক্লাসের ফাঁকে ও বলত ...এই গাধা,তুই কি কিছুই লিখতে পারিসনা? দেখিস না হিমু কি সুন্দর করে লিখেছে...এ হাত ছুঁয়েছে নীরার হাত। আমি কি এ হাতে কোন পাপ করতে পারি? ইস যদি কেউ আমার হাত ধরে এভাবে বলত. . . .দেখতাম নীলের অভিমানী চোখ দুটো ছলছল করে উঠতো। আমার খুব ইচ্ছে হত নীলের হাত ধরে বলি 'আমি আর কখনো পাপ করবোনা নীল, তোর হাত টা একটু ধরতে দিবি???
গত চৌদ্দই ফেব্রুয়ারীর কথা। খুব সকালে নীলের ফোন। ঘুম জড়ানো কন্ঠে মোবাইল রিসিভ করে বললাম 'কি রে, তুই এত সকালে? ওপাশ থেকে নীল শাসনের সুরে বললো 'আমি কলাভবনের সামনে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে চলে আয়। আমি স্বভাবতই একটু ঢিলেঢালা। নীল জানতো আমার আসতে আধঘন্টা লাগবে। তবুও অসহায় ছেলেটি আমার পথের দিকে তাকিয়ে থাকতো। কিছুক্ষন পর এসে দেখি নীল দাঁড়িয়ে আছে। নীল শার্ট পরা নীলকে দেখে মনে হল এক টুকরো আকাশ আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মুগ্ধ চোখে নীলের দিকে তাকিয়ে বললাম 'তুই আসলেই অনেক সুন্দর...'
নীল অভিমানের স্বরে বললো 'তুই আসলেই গাধা, এতো দিনে খেয়াল করলি? শুধু আমার মনের ভেতর কোথাও বেজে উঠতো ...ভালোবাসি তোমাকে. . ."
আজ অনেক দিন পরে আমরা আবার একটু বেরবো ...।। সকাল থেকেই নীলের জন্যে অপেক্ষা। কখনো ও এত দেরী করেনা। মনের মাঝে অজানা আশঙ্কা কাজ করছে। আজ আবার হরতাল। কখন কি হয় বলা যায়না। আজ অনুধাবন করলাম অপেক্ষার কষ্ট আসলেই অনেক। প্রতিবারই নীলকে যা আমার জন্যে সহ্য করতে হয়। এসব ভাবতে ভাবতে সামনে আগালাম। গোলাগুলির শব্দ। নীলের মোবাইলে ফোন দিলাম। অনেক আওয়াজের মধ্যে অপরিচিত একটা কন্ঠ বলল 'একটা ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়েছে,অভিযাত্রীর মোড়ে আসেন। আমি অবাক বাকরুদ্ধ হয়ে উদভ্রান্তের মত ছুটলাম। ভীড় ঠেলে সামনে এগিয়ে দেখি নীল। মাটিতে লুটিয়ে আছে। ফিনকি দিয়ে পরা রক্তের অজস্র ধারায় নীল শার্ট খানা খয়েরী হয়ে গেছে।. . . .
সবুজের ডাকে তন্দ্রা ভাঙলো। এই ওঠ বারোটা বাজে। নীলকে Wish করবিনা? হঠাত্ করেই নিজেকে আলাদা এক জগতে আবিস্কার করলাম। কি দুঃস্বপ্নটাই না দেখেছি। এক মুহুর্ত দেরী না করে নীলকে ফোন দিলাম। এক রিং হতেই নীল ফোন ধরল। 'কি ব্যাপার হাঁপাচ্ছিস ক্যানো?কি হয়েছে?????"
আমি বললাম 'নীল আমি তোকে অনেক অনেক ভালোবাসি।আমাকে ছেড়ে যাবিনাতো. . . .?'
নীল বললো কি পাগলের মত কথা বলছিস,কি হয়েছে বলবিতো? আমি বললাম "শোন কাল তোর আসতে হবেনা। দেশের অবস্থা ভালো না। কাল হরতাল...'
নীল অবাক হয়ে বলল ক্যানো?
মুখ থেকে মনের অজান্তেই বের হয়ে গেল 'আমি তোকে হারাতে চাইনা.
নীল আমার নীরবতায় কন্ঠ জোরালো করে বলল, কি রে চুপচাপ আসিস কেন?
নীলের ধমকে আমার বোধ ফিরে এল, ভাবলাম একি বলছি আমি।
যে দিনটার জন্য আমি এতদিন অপেক্ষা করেছি, হূদ মাঝারে যত্নে রাখা প্রিয় মানুষটাকে বিশেষ দিনে পাশে পাব না তা কি করে হয়।
ভাবনা শেষ না হতেই নীল চট করে বলল, ফোনটা কাট তো, আমি নিজেই তোর কাছে আসছি।নীলের কথাটা আমাকে পুরো হতবাক করে দিল।ফোনটা হাতে নিয়ে বিছানায় বসে রইলাম কতগুলো প্রশ্ন সাথে যুদ্ধের জন্য।যে নীল আমাকে এত ভাল বন্ধু ভাবে তাকে কিভাবে বলব, সে আমার ভালবাসা। না বলব না তাকে। এভাবেই আড়াল থেকে তাকে ভালবাসব আমি। হূদ মাঝারে রাখব জাড়িয়ে বন্ধুত্বের দাবি দিয়ে আজীবন।

১২ আগস্ট, ২০১৪

একজন মৌনতা - লেখক :মনতোষ দে

রাত তিনটে। হাতে ঘড়ি নেই ওর। তবুও সে বুঝতে পারে কারন এ সময়টা ব্রিজের উপর বসে থাকা টা তার প্রতিদিনের ব্যাপার। এক্টু ঠান্ডা বাতাস, নিচে নদীর কলকল পানি আর শহরের ব্যস্ত মানুষের ঘুম সব কিছুই তার অনেক ভাল লাগে। কারণ এই জিনিস গুলো কারও একার না... এসব ক্ষেত্রে সবাই এক। কি বড়, কি ছোট, কি ধনী, কি গরিব এই সময় টায় সবার ঘুমই গাঢ়। সে প্রতিদিন এসবই ভাবে, এজন্যি এই সময় টা তার এত্ত প্রিয়। ভাল লাগার মাঝে হঠাত করে কখনো কখনো চোখ থেকে জল পড়ে নদীর পানির সাথে মিশে গিয়ে এক হয়ে যায়। এটাতেও তার ভাল লাগে, এক হয়ে থাকার ভাল লাগা। ওর নাম মৌন। বয়স ১৩। নাম টা ওর নিজেরই দেয়া। বাবা মার দেয়া নামটা সে এখন কাউকে বলেনা। ওর এক ভাই, দুই বোন। ও তৃতীয়। ওর ছোট এক্টা বোন আছে। শহরের বেশ ভাল পরিবারেই ওর জন্ম। কিন্তু স্কুলে সে যায়না। এমন না তার পড়তে ইচ্ছে করেনা। কিন্ত পড়ার ইচ্ছের চেয়ে ছোট্ট মনের আত্মসম্মানবোধ টা বুঝি এক্টু বেশি।আর কালকের পর তো পড়ালেখার আর কোন মূল্য থাকবে না তার জীবনে।
আকাশের দিকে তাকিয়ে মৌন বাবা মার কথা ভাবছে। ছোট্ট বেলায় ওর কত্ত মজা ছিল। ৫ বছর বয়সে বাবা ভাইয়া আর ওকে সাইকেল দিয়েছিল। রোজ সেই সাইকেল বের করে তাদের নিজে শিখাত। মা তো ওর জন্য সবসময় নুডলস রান্না করত, নুডলস ওর অনেক প্রিয়। বড় আপু সবসময় অনেক আদর করত। বেশির ভাগ সময় তো আপুর সাথেই রান্নাবাড়ি খেলত। তখন বাবা মা কত্ত খেয়াল রাখত। ছোট বোন হওয়ার পর ও সেই আদর কমেনি। আর আজ!!! কোথায় সবকিছু!
এখন ও রাত তিন্টার সময় বের হয়ে আসলেও কেউ কিছু বলেনা। সব কিছু কেমন বদলে গেছে। বাবা ওকে শিখাবে কি, বাইরে পর্যন্ত নিয়ে যায়না। ও যেতে চেয়েছিল সেদিন। কিন্তু বাবা হুট করে রেগে গিয়ে বাসার সবাইকে অনেক গালাগালি করে বের হয়ে গেলেন। ওকে কিছু বলেন্নি কিন্তু মৌন জানে রাগটার কারণ তার বাইরে যেতে চাওয়া।
ভাইয়া, আপুর ব্যাবহার ও আলাদা। আজকাল ওদের চোখে একধরণের ভয় আর ঘৃণার মিশ্রন দেখা যায়। বিশেষ করে সেদিনের ড: রিপোর্ট পাওয়ার পর।
মা ও আগের মত নেই। কথা বলে না তেমন। একা একা ঘরে বসে কাদে শুধু। মৌন প্রায় ঈ দরজার বাইরে দাড়িয়ে থাকে। ওর আসল নাম ধরে মায়ের আদুরে ডাক শোনার জন্য। কিন্তু ক্লান্ত হয়ে ফিরে আসে। ফিরে আসার সময় ও তাকায় বার বার। হয়তো মা দৌড়ে বের হয়ে জড়িয়ে ধরে বলবে ' আমার সোনা মানিক!!! নুডলস খাবি?'
এখন শুধু ছোট বোন টাই ঠিক আছে। হয়তো সে এখনো বুঝে না।যখন বুঝবে হয়তো ও আর ভাইয়া বলে কোলে আসতে চাইবে না। এক্টা রিপোর্ট পুরো জীবন্টাই পাল্টে দিল মৌনর। আগে স্কুলে বন্ধুরা খেপাত মেয়ে মেয়ে বলে। কিন্তু এখন রিপোর্ট অনুযায়ী সে ছেলেও না মেয়েও না।সবাই হিজড়া বলে। হিজড়া কি জিনিস মৌন বেশি বুঝেনা। শুধু জানে এমন একটা কিছু যাকে সবাই ঘৃণা করে, ভয় করে, এড়িয়ে চলে, পরিচয় করিয়ে দিতে চায়না। রিপোর্ট পাওয়ার পরদিন থেকে আর কোনকিছু ঈ আগেরর মত নেই। ওকে স্কুলে যেতে চাইলে, ভাইয়া বলছিল, ' 'ওটা ছেলে আর মেয়ের combined স্কুল! তোর জন্য না' অনেক অবাক হয়েছিল মৌন।কোনদিন বাহানা করে স্কুল না যেতে চাইলে এই ভাইয়াই ভয়াবহ আকারে কানমলা দিত।
তবে আজ এসবে আর এত অবাক লাগেনা। ও বুঝে গেছে দুনিয়ার কাছে ওর প্রয়োজন সেদিনই শেষ হয়ে গেছে, ওর ছোট্ট সেই পরিবারটা থেকেও। এখন প্রায় বাড়িতে এক্টা লোক আসে। সে মৌন কে নিয়ে যেতে চায় নদীর ওপারে মৌন এর মত হিজড়াদের কাছে। মৌন অবশ্য না বলেনি। একটি বারো বাবা কিংবা মার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেনি ও থাকবে কিনা। কারণ ও জানে, এখানে ওর থাকার কোন মানে হয়না। ও এখানে আলাদা। নদীর ওপাড়ে গিয়ে যদি কারো সাথে এক হয় তাহলে হয়তো ভাল লাগবে। আর বাবা মাও কিছু বলেনি, তাদেরো হয়তো ভাল লাগবে। একবার চোখ তুলে শুধু জিজ্ঞেস করেছে, ও যখন মরে যাবে তখন সে বাসায় আসতে পারবে? লোক্টা বলেছে, না হিজড়া রা নাকি যেখানে থাকে সেখানেই লবণ দিয়ে দাফন করতে হয় তাতে পাপ মুছে পরের জন্মে পুরো ছেলে বা মেয়ে হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অনেক শক্ত হয়ে যাওয়ার পরো কথাটা শুনে মৌন কান্না থামাতে পারেনি। দৌড়ে গিয়ে ছোট্ট বোনকে কোলে নিয়ে কেঁদেছে। কাল সে চলে যাবে। কি করতে হবে ওখানে সে জানেনা।এরপর হয়তো ওর লাশটাও আসবে না ওর নিজের বাড়িতে।
ভোর হওয়া শুরু করেছে। কিছুক্ষনের মধ্যেই আবার ব্যস্ত হওয়া শুরু হবে শহর। শেষ বারের মত সবাই কে দেখতে ইচ্ছে করছে মৌনর"
-- অসংখ্য ভাজযুক্ত এক্টা কাগজে লিখাটা আজ সকালে কে যেন আমাদের বাসার পোস্টবক্সে রেখে গেছে।হয়তো বাবার পত্রিকায় ছাপানোর জন্য। লিখাটা দৌড়ে বাবার কাছে নিয়ে গেলাম। বাবা পেপার পড়ছে। - বাবা দেখ। এক্টা অনেক সুন্দর লেখা কে যেন দিয়েছে। বাবা প্লিজ এ লেখাটা ছাপিও - ওহ মামনি। অনেকেই ভাল লিখা দেয়। দাড়াও এক্টা খবর পড়ছি - না বাবা লেখাটা অন্যরকম। তুমি পড়েই দেখ। উফ! কি পড়ছ মন দিয়ে? দেখনা। - আজ আমাদের ব্রিজের নিচে ১৩ বছরের এক বাচ্চার লাশ পাওয়া গেছে। পুলিশ ভাবছে আত্মহত্যা। এতটুকুন পিচ্চির কি সাহস রে বাবা! দেশ যে কোথায় যাচ্ছে!!
বুক্টা ধ্বক করে ঊঠল আমার। মৌন নয় তো?? নিজেরর বাসায় দাফন হওয়ার জন্য ও এটা করল না তো? আর থামাতে পারছিনা নিজেকে।
- কি ব্যাপার মা? কাদছ কেন? আরে!!! কি হল?????? - বাবা, আমি ছেলে হলে ভাল হত? - ধুর পাগলি!! আমার কাছে ছেলে মেয়ে সমান। দুইটা ঈ তো আমার সন্তান! -আর হিজড়া হলে???? বাবা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।

অদেখা বাঁধন - লেখক : মনতোষ দে

ঋজুর সাথে আমার পরিচয় ফেসবুকে। তিন বছর আগের ঘটনা। শেষের কবিতা পড়ে তখন ঋজুর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি এবং একজন ঋজুর খোঁজে পাগলের মত ফেসবুক চষে বেড়াচ্ছি। ফেসবুকে ঋজুদের অভাব নেই। ঋজু নামে সার্চ দিতেই প্রায় কয়েকশো ঋজু এল। এরমধ্যে কেউ কেউ বালুরঘাট কলেজ থেকে পাশ করেছে । এরকম আরও কতো শত .........।। কিছু কিছু ফেক আইডি ও রয়েছে ...... আমি মোটামুটি আশাহত হলাম এত ঋজুর খোঁজ এক সাথে পেয়ে ...। রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকলে সুবিধা হত। তাঁর কাছ থেকে একদিনের জন্য ঋজুকে ধার চাইতাম।
কথায় আছে কোন কিছু মনে প্রানে চাইলে ভগবান তা মানুষকে মিলিয়ে দেয়। আমি ঋজুকে পেলাম। তবে কোন লাবন্য নাম ধারী আইডিতে না। খুব সাধারন একটি আইডিতে। জল জোছনা। জলের ওপর জোছনার অপূর্ব প্রতিফলন আমি অনেকবার দেখেছি। তবে জল জোছনা নামটি সম্পূর্নই আমাকে পাল্টে দিল। দিন কিংবা তারিখ মনে নেই। তবে এটুকু মনে আছে মন খারাপ করা একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। আমি তখনো জানতাম না একটি স্ট্যাটাস ই আমার জীবনে ঋজুকে এনে দেবে। স্ট্যাটাসটি ছিল ছুটি শেষে কলেজে ফিরে যাওয়া বিষয়ক। দেখলাম কিছুক্ষন পর ইনবক্সে একটি মেসেজ। চার লাইনের একটি কবিতা সাথে কয়েকটি লাইন। কবিতাটি ছিল,
"প্রিয় কেউ যদি কষ্ট দেয় মনের সংগোপনে আকাশ ভাঙা কান্না তাই আসে চোখের কোনেদুঃখ ভরা সেই প্রহরে আমায় করো মনেদোলা দেব হাসি হয়ে তোমার অধর কোনে"
''কবিতাটি তোমার দেয়া স্ট্যাটাস থেকে নেয়া। আমি কবিতা লিখতে পারিনা। তাই তোমার কবিতা দিয়ে তোমাকেই শান্ত্বনা দিলাম। তোমার মন ভালো হয়ে যাক। ছুটি শেষে আবার ফিরে এসো। ঋজু"
ঋজু নামটা দেখে বুকের কোথাও চিনচিনে ব্যথা অনুভূত হল। আমি খুব সুন্দর একটি রিপ্লাই দিলাম। এরপর থেকে চ্যাটিং। একটা পর্যায়ে ঋজু ওর জীবনের অনেক কিছুই শেয়ার করলো। আমাদের মোবাইলে কথা হল। জানতে পারলাম ঋজু আমার চেয়ে তিন বছরের বড়। কোলকাতায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। ঋজুর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বেড়ে গেল। আমার বড় কেউ ছিলনা। ঋজু যেদিন থেকে এই নির্মম সত্যটি জানলো সেদিন থেকেই আমার জীবনের এই অপূর্নতাটা পূরন করতে উঠে পড়ে লাগলো। ভাবতে অবাক লাগত ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া ব্যস্ত তাঁর গতানুগতিক জীবন,পড়ালেখার চাপ, ল্যাব, বন্ধু আড্ডা আর হাজার কাজের ভীড়েও আমাকে স্মরন করছে। ফোন করে কথা বলছে। উপদেশ দিচ্ছে।
আমাদের কলেজ হোস্টেল এক অদ্ভুত শাসনের অন্তভূক্ত হওয়ায় প্রতিটি চিঠিই সেন্সর করা হতো। অর্থাত্ প্রথমে তা বড় দাদারা পড়তেন এবং পরে আমাদের কাছে দিতেন। বাবা মা ছাড়া অন্যকারো চিঠি অ্যলাউ ছিলনা। তবুও অনেক কষ্টে সেই নিয়ম কানুন এর ফাঁকেও ঋজু চিঠি পাঠাতো। আমি প্রতিদিন হাউসবেয়ারার কাছে ওর চিঠির খোঁজ নিতাম। ঋজু, কোলকাতা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। এই লাইনটি চিঠির ওপর দেখলে আমার অবরুদ্ধ মন তখন আনন্দে আত্মহারা হয়ে যেত। আমাদের ক্লাসের অধিকাংশ ছেলেই তখন প্রেম করছে। প্রতিদিন তাদের নতুন নতুন প্রেম আর ছ্যাঁকা খাওয়ার রোমাঞ্চকর গল্প শুনি।
মাঝেমাঝে ঈর্ষান্বিত হই ক্যানো আমার গার্লফ্রেন্ঠ নেই এই ভেবে।এর মাঝে ঋজুর পাঠানো একটি চিঠিই আমার অশান্ত মনকে শান্ত করতো। মনে হতো পৃথিবীতে অন্তত কেউ একজন আছে যে এই আধুনিক যুগেও আমাকে ভেবে লেখে। আমার জন্যে লেখে। উল্লেখ আমাদের কলেজে মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ ছিল। তাই এত আয়োজন। হঠাত করে অনুভব করলাম পৃথিবীতে প্রেম কিংবা ভালোবাসার বাইরেও এক নিবিড় ও পবিত্র সম্পর্ক সম্ভব। যা আমার আর ঋজুর মধ্যে ছিল।চিঠির মাধ্যমেই আমাদের সম্পর্ক আরো গাঢ় হল। একটা পর্যায়ে চিঠির সাথে কার্ড আসা শুরু হল। ভেতরে অপরিপক্ক হাতের কিছু নকশা। আমি বুঝলাম এতসব আয়োজন,আঁকিবুঁকি সবই আমাকে খুশী করার জন্য। কিছুদিন পর কলেজে মোবাইল ফোন নিলাম। এক প্রকার টীচার দের চোখ এড়িয়ে। ততদিনে বেশ সিনিয়র ও হয়ে গেছি। ঋজুর সাথে কথা হত দুপুরে। লাঞ্চ এর পর। স্যারদের হাত থেকে বাঁচার জন্য খাঁটের তলা বেছে নিতাম কথা বলার নিরাপদ জায়গা হিসেবে। ঋজু নিজেই ফোন করতো । এক ঘেঁয়েমির ক্লান্ত সময়ে যেন এক চিলতে প্রশান্তি। আমাদের সময় গুলো ছিল অস্বাভাবিক সুন্দর। মুঠোফোনের বেতার তরঙ্গে সম্পূর্ন অদেখা এক অদ্ভুত সম্পর্কের ভীত গড়ে উঠছে। কখনো কখনো ছোট ভাইয়ের মত ওর কাছে ভীরু আব্দার আবার কখনো ও শাষনকর্তা। গতিময় জীবনের ফাঁকে স্থবিরতা আনার সুযোগ ও কখনো দেয়নি। আর তাই তুমুল বর্ষা কিংবা অপূর্ব জোছনার মায়াবী রাত সব সময়ের সঙ্গী ছিল ও। ওর মনখারাপের মুহূর্ত কিংবা প্রবল উচ্ছাসে কাটানো কলেজের পিকনিক সব কিছুই ভাগ করে নিত নিদ্বির্ধায়।
ওর হাত খরচের টাকা বাঁচিয়ে বহুবার ও আমার জন্যে অনেক কিছু পাঠিয়েছে। ওর দাবী ছিল একটাই কোলকাতায় গিয়ে ওর সাথে দেখা করা। একটা পর্যায়ে কলেজ থেকে বের হয়ে ইউনিভারসিটি লাইফে পদার্পন করলাম। তবুও সম্পর্ক থাকলো আগের মতই। সেই আগের মতই ফোন দেয়া। খোঁজ খবর নেয়া। তবে চিঠি দেয়াটা একটু কমে গেছে। জীবনের হিসেবে আমার ও সময় হয়ে ওঠেনি ওর সাথে দেখা করার। সুদীর্ঘ তিন বছরের বিন্দু বিন্দু আবেগ অনুভূতি তখন সিন্ধুর রূপ নিয়েছে।
এমনি এক ছুটির সকালে ঋজুর ফোন এলো। নিজের কানকে বিশ্বাস করাতে কষ্ট হয়েছিল যখন শুনলাম ও উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছে।
কোলকাতা থেকে সরাসরি উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়। উদ্দেশ্য এই অভাগাকে দেখা। আমি বিশাল বড় একটা সারপ্রাইজ পেলাম। মনে হল ক্ষুদ্র জীবনে বেঁচে থাকার অনেক মানে আছে। বিশাল এ পৃথিবীর কাছে আমরা ক্ষুদ্র হলেও কারো কারো কাছে আমরা পৃথিবীর মত বিশাল। সৃষ্টিকর্তা এক অদেখা বাঁধন তৈরি করেছেন আমাদের মাঝে। যা জটিল এবং ভয়াবহ রকমের সুন্দর।অবশেষে ঋজু আমার সামনে এলো। শেষের কবিতার ঋজু। যতটুকু আমার কল্পনায় ছিল তার চেয়েও অনেক বেশি স্নিগ্ধ। প্রিয় মানুষ গুলোর পাশে থাকার মুহূর্তগুলো যে অদ্ভুত সুন্দর তা টের পেলাম ওর উপস্থিতিতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্ত পরিবেশ থেমে থেমে অশান্ত হচ্ছে ওর আর আমার পাগলামীতে। দেখে কে বলবে এ আমার চেয়ে তিন বছরের বড়। প্রিয় মানুষগুলোর পাশে থাকার মুহূর্ত আসলেই অদ্ভুত সুন্দর। চেনা আবেগ চেনা হাত ধরা আর সবশেষে চির চেনা সেই বিদায়।
ঋজু আমার হাত ধরে কেঁদেই ফেলল।মনে হচ্ছিল গল্পের শেষ কোনদৃশ্যে এসে আটকে গেছি। ইচ্ছে করলেই ঋজুর চলে যাওয়াটাকে ফেরাতে পারবো। কিন্তুবাস্তবতা গল্পের মত নয়। তবে সুন্দর একটি ছেলেকে চোখেরসামনে কাঁদতে দেখে মনে হল বাস্তবতা গল্পের চেয়েওসুন্দর। মনে মনে তখন একটি গানই বাজছিল,
"যদি শেষ দেখায় এ হাত ধরে
ঐ চোখ জলে ভরেযদি বাঁচতে ইচ্ছে হয় আরো কিছুক্ষন
তবে রেখোনা অভিমানমনে অকারন
মমতা যদি বা গড়ে ওঠেযদি চেনা টানে মন ছোটে
তবে দাও গেঁথে এ বেলায় অদেখা বাঁধন/পিছু ফেরার এ আয়োজনে করোনা বারন
এনেছি তোমার অনেক শখের সেইমিষ্টি উপহার
আঙুলের ছোট ছোট আদরে নাওনা শেষবার
কাজলের দীঘি ছুঁয়েই বুঝিএত মায়ার কারন
বুঝলোনা শুধু এই অবাক ভুবন
দুটি হৃদয়ের সেই কথোপকথন. . . . . . . .
নির্বাক পৃথিবী আসলেই সবাক হৃদয়ের কথোপকথন বোঝেনা।...............।।
যখন-ই স্বপ্ন দেখা শুরু করি তখন-ই স্বপ্ন গুলো ভেঙ্গে যায় এক অদূশ্য ঝড়ে, সুখ গুলো উড়ে যায় হাওয়ায়, হেরে যাই আমি স্বপ্নের কাছে, হেরে যাই বার বার জীবনের কাছে. স্বপ্ন আর বাস্তব এক নয় এই কথা ভুলে ও আসেনা মনে, শুধু স্বপ্ন দেখেই গেলাম জীবন ভর, বাস্তবতা খুজে পাইনি আজ ও। কত শত প্রিয় জন কত প্রতিস্রুতি দিয়ে আশায় বুক বাধাঁলো ।কত স্বপ্ন দেখালো দু চোখ ভরে, আজ জীবনের ক্লান্তি কালে চলে গেল সবাই নিজ গন্তব্যে ।শুধু পড়ে আছি আমি পথ ভুলা পথিকের মতো ,আজ স্বপ্ন গুলো আর বাসা বাধেঁনা চোখের পাতায়, দুঃখে কষ্টে বুকের পাজর গুলো ক্ষত বিক্ষত, হৃদয়ের প্রতিটি স্বপ্ন ভাঙ্গার যন্তনায় আমাকে প্রতি মুহুর্তে মৃত্যুর পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ।স্বপ্নের পিছু ঘুরতে ঘুরতে আজ বড়-ই ক্লান্ত আমি।
উৎসর্গ : প্রিয় জল জোছনা অথবা শেষের কবিতার ঋজু.......

আমাদেরও কিছু গল্প আছে। শোনার মত মানসিকতা কি আছে তোমার?

আমাদেরও কিছু গল্প আছে। শোনার মত মানসিকতা কি আছে তোমার?